সংসদ সদস্য বনাম স্বাস্থ্য সচিব

স্টাফ রিপোর্টার / লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর :

স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নান নিজের গ্রামের বাড়িতে কমিউনিটি ক্লিনিক বানাতে গিয়ে স্থানীয় এমপি নূর মোহাম্মদ (সাবেক আইজিপি) এর লোকদের দ্বারা মারধর খেয়ে র‌্যাবের প্রহরায় ঢাকায় ফেরত এসেছেন।

তিনি দাবী করছেন, কিছুদিন আগে তাঁর স্ত্রী মারা গেছে, তাই তিনি এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করতে গেছেন, যেটা এমপির পছন্দ হয়নি। লাটিসোটা নিয়ে এমপির লোকজন বাড়ি-ঘর ঘেরাও করে মারধর করেছে। সচিব আবদুল মান্নানের প্রটোকলে থাকা এসি ল্যান্ডকে ব্যাপক পিটিয়ে পুকুরে ফেলে দিয়েছে। সচিব আবদুল মান্নান দীর্ঘক্ষণ নিজের বাড়িতে অবরুদ্ধ ও অসহায় অবস্থায় ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে এমপি, সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সে ওয়াক্ফর জমি দখল করে, এলাকায় যা খুশি তা করে বেড়ায়। এমনকি অন্যের জমি দখল করে ও মাজারের জমি দখল করে সেখানে কমিউনিটি ক্লিনিক করছে। এসব ব্যাপারে লোকজন প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর পায় না। এলাকার মানুষ তার অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হওয়ায় তারা রুখে দাঁড়িয়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ঘটনাটি ঘটেছে। এলাকার এমপি হিসেবে এলাকাবাসীর এই কাজ পরোক্ষভাবে হলেও আমার ওপরই বর্তায়।
অবরুদ্ধদশা থেকে বের হয়ে প্রশাসনের নিরাপত্তা বলয়ে গ্রাম ছাড়ার আগে তিনি অভিযোগ করেন, তার উদ্যোগে নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিক এবং বাড়িতে ভাঙচুর ও হামলা করেছে এমপির নির্দেশে তার সমর্থকরা।

হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে কিশোরগঞ্জ-২ আসনের এমপি নূর মোহাম্মদ বলেন, আমাকে না জানিয়ে এলাকার উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। আমি যদি নির্দেশ দেই, তাহলে উনি (সচিব) এলাকাতেই আসতে পারবেন না।
ইতিমধ্যে তিনজন গ্রেফতার হয়েছে, আর সেই তিনজন এমপির ঘনিষ্ঠ বলেই এলাকায় পরিচিত। দুটি মামলায় আরও গ্রেফতার হবে বলে জানানো হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। ইতিমধ্যে ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই ওসি নূর মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে ‘ভূমিদস্যু’ স্বাস্থ্যসচিবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশও করেছে। তাকে এলাকায় অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছে।

আমলারা কি রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছেন?

গত মার্চে করোনা মোকাবেলার সময় জেলাগুলোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সচিবদেরকে। এর পর থেকে স্থানীয় এলাকাগুলোতে সচিবদের প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়েছে। প্রশাসনিক প্রয়োজনে সচিবদের এলাকায় ঘন ঘন যাওয়া হচ্ছে আর এ কারণে অনেক এলাকার স্থানীয় এমপি কিংবা মন্ত্রীদের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে।

অনেক এলাকাতেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে যে, আমলারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি আগ্রহী হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা নতুন মেরুকরণ এবং অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, আমলাদেরকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো তারা সেই দায়িত্বের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছেন যা অনাকাঙ্খিত। আবার সচিবদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা যখন এলাকায় যাচ্ছেন সেটা স্থানীয় সংসদ সদস্যরা সহ্য করতে পারছেন না। অনেকক্ষেত্রে তারা স্বাভাবিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছেন। আমলা এবং জনপ্রতিনিধিদের এই বিরোধ বিভিন্ন জায়গায় ক্রমশ প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে।
একজন সচিব যখন এলাকায় যাচ্ছেন তখন জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তার প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছেন এবং জেলার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এতে করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রভাব এবং ভূমিকা ক্ষুণœ হচ্ছে যা জনপ্রতিনিধিরা পছন্দ করছেন না। একাধিক জনপ্রতিনিধি বলেছেন যে, এলাকায় কি কর্মকাণ্ড হচ্ছে সে ব্যাপারে জনপ্রতিনিধিদের সেভাবে জানানো হচ্ছে না। প্রশাসনিকভাবে সবকিছুর সিদ্ধান্ত হচ্ছে। আর এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। তাছাড়া, আমলাদের অনেকের মধ্যেই এখন রাজনৈতিক অভিলাষ ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে চাকরিতে থেকেই তারা এ প্র্যাকটিস করেছেন। সরকারই তাদেরকে সেদিকে ধাবিত করেছে। সরকারি দলের সিল গায়ে না থাকলে পদোন্নতি পদায়ন পাওয়া যায়নি। আর এ প্র্যাকটিস করতে গিয়ে ক্রমান্বয়েই তারা পুরো মাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। ইতিপূর্বে জেলার দায়িত্ব দেয়া হতো মন্ত্রী-এমপিদেরকে। এটাই বরাবর প্রচলন ছিল। এখন সচিবরা জেলার দায়িত্ব পালন করছেন। এসবের সুবাদে সচিবরা অনেকেই চাকরি থেকে অবসরের পর এমপি-মন্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখছেন। শুধু কিশোরগঞ্জেই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানেই এমন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে আছে।

সরকারি দলের একজন সাংসদের সঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার এই বিরোধ-–সংঘাত কেন? বোঝা যায়, নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখা, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ আর স্বার্থের দ্বন্দ্ব যখন সামনে চলে আসে, তখন বাকি সব অর্থহীন হয়ে পড়ে।

কটিয়াদীতে স্বাস্থ্যসচিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা
স্বাস্থ্যসচিব আবদুল মান্নানের ওপর গ্রামের বাড়িতে হামলা চালানোর পর সচিবকে তাঁর নিজ এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। হামলার পরদিন দুপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ সভা থেকে স্বাস্থ্যসচিবকে কটিয়াদীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। কটিয়াদী ডিগ্রি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে অনুষ্ঠিত সভায় এ ঘোষণা দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দিলীপ ঘোষ। পরে এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জড়ানোর প্রতিবাদে মিছিল হয়। মিছিলটি থানা ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। স্বাস্থ্যসচিবকে বিষোদগার করে সভায় বক্তব্য দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন, গিয়াস উদ্দিন, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হোসেন প্রমুখ।
স্বাস্থ্যসচিবের বাসায় হামলার ঘটনায় কটিয়াদী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও হামলার অভিযোগ এনে করা মামলাটির বাদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল আলম। এই মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে চারজনকে। অজ্ঞাতনামা আসামি আরও ১৫ থেকে ২০ জন। অপর মামলাটি করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী আতিকুর রহমান। মামলাটি হয় হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের ধারায়। মামলাটিতে এজাহারভুক্ত আসামি নেই। অজ্ঞাতনামা আসামি ২০ থেকে ২৫ জন।
কটিয়াদী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম বলেন, দুই মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তিনজনকে। মূল অভিযুক্তদের ধরতে পুলিশি অভিযান চলছে।
তবে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় জেনে খুশি নন স্বাস্থ্যসচিবের পরিবারের সদস্যরা। স্বাস্থ্যসচিবের ছোট ভাই নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মূল অভিযুক্তদের কেউ গ্রেপ্তার হননি। যাঁরা হয়েছেন, তাঁরা এই ঘটনায় জড়িত কি না, তা-ও সন্দেহ। আমি নিজে বাদী হয়ে একটি এজাহার জমা দিয়েছি। আমার এজাহারে সাংসদ নূর মোহাম্মদের (সাবেক আইজিপি) ভাগনে মুন আহমেদ ও সাংসদের ব্যক্তিগত সহকারী আমজাদ হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো আমার এজাহারটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি।’
স্বাস্থ্যসচিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার কারণ জানতে চাওয়া হলে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ঘটনা ঘটেছে স্বাস্থ্যসচিবের বাড়িতে। অথচ মামলার আসামি করা হয়েছে সারা কটিয়াদীর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের। দলের সঙ্গে প্রশাসনের ঝামেলা বাধানোর মূল নায়ক স্বাস্থ্যসচিব। কটিয়াদীকে ঝামেলামুক্ত রাখতে স্বাস্থ্যসচিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।
সচিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার কথা জেনে তাঁর ভাই নাসির উদ্দিন বলেন, ‘অবাঞ্ছিত শব্দটি এসেছে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দিলীপ ঘোষের মুখ থেকে। তিনি তো আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন না, সাংসদের দালালি করেন। দালালি আর রাজনীতি তাঁর পেশা। আজ সরকারের একজন সচিবের বিরুদ্ধে অবাঞ্ছিত শব্দটি ব্যবহার করতে দিলীপ ঘোষ এতটুকু চিন্তা করলেন না। আমার ধারণা, স্বার্থে আঘাত পড়লে সরকারকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে তিনি কুণ্ঠাবোধ করবেন না।’
সম্প্রতি গ্রামে স্বাস্থ্যসচিবের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া ৮ শতাংশ জায়গার ওপর একটি স্যাটেলাইট কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হচ্ছে। ক্লিনিকটির নামকরণ করা হবে করোনায় মারা যাওয়া স্বাস্থ্যসচিবের স্ত্রীর নামে। ক্লিনিকে যাওয়ার একটি সড়কও নির্মাণ করা হচ্ছে। উভয় কাজে সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছেন স্বাস্থ্যসচিব। ক্লিনিক ও সড়ক নির্মাণের জায়গা নিয়ে স্বাস্থ্যসচিবের সঙ্গে এলাকার কিছু মানুষের মতবিরোধ হয়। এ ছাড়া ক্লিনিক নির্মাণ বিষয়ে সাংসদকে অবগত করা হয়নি, এমন অভিযোগ সাংসদের অনুগত ব্যক্তিদের। ইস্যুটি নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে থেকে উত্তেজনা চলছিল।

কিশোরগঞ্জ জেলায় করোনার টিকা প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধন করতে স্বাস্থ্যসচিব ৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়িতে আসেন। শনিবার সকালে একদল মানুষ স্বাস্থ্যসচিবের বাড়িতে ও ক্লিনিকে দফায় দফায় হামলা চালায়। স্বাস্থ্যসচিবের পরিবারের সদস্যদের দাবি, হামলাকারীরা সাংসদের অনুগত। সাংসদের ইশারায় লোকজন তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল আলমকে হামলাকারীরা পুকুরে ফেলে দেয়। আহত করে আরও সাতজনকে। এই ঘটনায় স্বাস্থ্যসচিব টিকা উদ্বোধন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বাতিল করে র‌্যাব প্রহরায় ঢাকায় ফিরে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *