সরকারের পদক্ষেপেই শিশুশ্রম হ্রাস পাচ্ছে

সালমা আফরোজ / লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর :

রাজধানীর মিরপুর পল্লবীর ১২ নম্বর থেকে খামারবাড়ী বাসস্ট্যান্ট পর্যন্ত প্রতিদিনের যাওয়া-আসা। মাঝে ১১ ও ১০ নম্বর, এরপর কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও হয়ে খামারবাড়ী। এ পথেই দৈনন্দিন চলাচল। বাসের সিটে বসেই শোনা যায় ফেরিওয়ালাদের চিৎকার-চ্যাঁচামেচি। ১০ নম্বর সিগন্যালে থামলেই বাসগুলোয় উঠে পড়ে অল্প থেকে মধ্যবয়সি সব ফেরিওয়ালা। লকডাউনের পরপর যখন বাস চলাচল শুরু হলো, তখন শুধু মাস্কের ফেরিওয়ালাদের দেখা যেত, তবে এখন আমড়া-পেয়ারাওয়ালাদেরও দেখা যাচ্ছে। ছোটো ছোটো শিশু লাফ দিয়ে উঠছে-নামছে। মাঝে মধ্যে ভয়ই লাগে এই বাচ্চা শিশুরা জীবনের তাগিদে কীভাবে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

এ রকম একদিন বাসে লাফিয়ে উঠে আট-দশ বছর বয়সের দুটি ছেলে। একটু অবাক হতে হলো। যেই বয়সে ওদের মা-বাবার আদরে ঘরে থাকার কথা, সেই বয়সে তারা বাসে মাস্ক, আমড়া-পেয়ারা বিক্রি করছে। একজনকে তার নাম জিজ্ঞেস করতে
হাসিমুখে বলল, হাসান। বাসের মাঝখানে ঘুরে ঘুরে চিৎকার করছে আপা, ভাইয়া আমড়া পেয়ারা নেন। ওরা জানাল সারাবছরই তারা আমড়া-পেয়ারা বিক্রি করে। কিছুদিন আগে করোনাভাইরাসের সময় খুব মাস্ক বিক্রি করেছে। এখন আমড়া আর পেয়ারার চাহিদা বেড়েছে। সারাদিন বিক্রির পর নাকি ভালোই লাভ হয়। অনেক সময় নাকি তারা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকাও আয় করে। সংক্ষিপ্ত আলাপে জানা
গেল, হাসান থাকে ১০ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশে তার মায়ের সঙ্গে। বাবা কে বা কোথায় থাকেন, সে জানে না। মা মানুষের বাসায় ঝিয়ের কাজ করেন। বড়ো হয়ে কী করবে জানতে চাইলে সে বলে, আর কী করব, এখন যে কাজ করছি সেটাই করব।
মা বলেছে, ঢাকায় ভালো লাগে না দেশে চলে যাবে।
তার বন্ধু জসিম। স্টেডিয়ামের পাশেই বাবা-মা, এক ভাইসহ তাদের সংসার। তার
বাবা রিকশা চালায়। মা রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করে। বাকি সময় বাসায় থাকে।
তার ইচ্ছা বড়ো হয়ে ব্যবসা করবে। তার মতে, ব্যবসা করলে তাড়াতাড়ি বড়োলোক
হওয়া যায়। সে শুধু মাস্ক বিক্রি করে। এখন অনেক কম দামে মাস্ক পাওয়া যায়, তাই বেশি লাভ হয় না। জসিমের বাবার আদেশ প্রতিদিন কমপক্ষে দেড় শ টাকা রোজগার

করতেই হবে। তা না হলে তাকে খেতে দেওয়া হবে না। সেও কম চালাক না। প্রতিদিন
যেভাবেই হোক দেড় শ টাকার বেশি রোজগার করে। মাঝেমধ্যে ভিক্ষাও করে। এছাড়া
কোনো উপায় নেই তো! এভাবেই জসিম বাবার টাকা দিয়ে বাকি টাকা
ভবিষ্যতের জন্য জমায়। চলতে-ফিরতে তার ঠোঁটে কোনো-না-কোনো বাংলা
সিনেমার গান আছেই। বয়স সমান শুধু পেশা ভিন্ন, যে বাসে করে একজন মা
তার শিশুকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করে, সেই বাসেই একই বয়সি শিশুরা
বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে। এরকম হাজারও শিশুর সাধারণ নাম পথশিশু, পথেই
বসবাস, পথেই জীবন।
পথশিশুদের ব্যাপারে প্রতিক্ষণ ফাউন্ডেশনের প্রধান হেলেনা কবীর বললেন, এসব শিশুর
পড়ালেখা শেখাতে হবে। প্রথমেই তাদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। দেশকে উন্নতি
করতে হলে তাদের বাদ দিয়ে নয়। তাদের নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
প্রতিক্ষণের মতো প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, শিশু অধিকার ফোরাম, আশার মতো অনেক
প্রকল্প রয়েছে। এসব এনজিও ফাউন্ডেশন নারী ও শিশুর চিকিৎসা সহায়তা, আইনি
সহায়তা ও পুনর্বাসনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। রয়েছে সরকারের নানা পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে শিশুদের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সহযাত্রী যারা, তাদের মধ্যে শিশুর
কল্যাণে পরিচালিত কর্মসূচি ফলপ্রসূ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে
কাজ করে ইউনিসেফ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইউনিসেফ বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয়
পর্যায়ে বহু সহযোগীর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করে আসছে আমাদের দেশে
ইউনিসেফের মূল অংশীদার বাংলাদেশ সরকার। ইউনিসেফ ও সরকার ২০০৬ সালে
একটি মৌলিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৮টি খাতে ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ শিশু শ্রমিক রয়েছে। এক গবেষণা মতে, শিশুশ্রম বেশি কৃষি ও কলকারখানায়। সেখানে ১০ লাখের বেশি শিশু কাজ করে। এছাড়া দোকানপাটে ১ লাখ
৭৯ হাজার, নির্মাণ শিল্পে ১ লাখ ১৭ হাজার শিশু কাজ করে। বর্তমানে শিশুশ্রমে নিয়োজিত আছে এমন ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু একসময় স্কুলে গেলেও এখন আর যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *