ভালো কিছু করার আগেই লুট বিআইএফএফএল

স্টাফ রিপোর্টার / লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর :

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল)। প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা পর্ষদে রয়েছেন তিনজন মন্ত্রী, একজন উপদেষ্টা ও একজন প্রতিমন্ত্রী। পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন সাতজন সচিব। কিন্তু তাদের পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫৮৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন বিআইএফএফএলের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফরমানুল ইসলাম। অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেয়া এ অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

২০১১ সালের বিআইএফএফএল গড়ে তোলার পেছনে মূল উদ্দেশ্যই ছিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রকল্প ও বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়ন। এসব প্রকল্পে অর্থায়নের পর অর্থ উদ্বৃত্ত থাকলে তা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু দেখা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগেই বেশি ঝোঁক ছিল বিআইএফএফএলের শীর্ষ কর্মকর্তার।

পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই বিআইএফএফএলের অর্থ বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ও এনবিএফআইয়ে জমা রেখেছেন তিনি, যার একটি বড় অংশ বর্তমানে অনাদায়ী রয়েছে এবং বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিআইএফএফএলের ৫৫ কোটি টাকা এফডিআর রয়েছে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে, যেটি এরই মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশে অবসায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ রয়েছে দুটি দুর্বল বেসরকারি ব্যাংকে। প্রিমিয়ার ফাইন্যান্স, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি ও প্রাইম ফাইন্যান্সে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে বিআইএফএফএলের।

অনিয়মের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে বিআইএফএফএলের ৫৮৪ কোটি টাকা অনাদায়ের ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে গতকাল প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফরমানুল ইসলামসহ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় এস এম ফরমানুল ইসলাম ছাড়াও বিআইএফএফএলের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ও তহবিল ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান নিসারুল কবির সিদ্দিকীকেও আসামি করা হয়েছে।

২০১১ সালে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে গঠিত হয় বিআইএফএফএল। এখন প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অর্থনৈতিক অঞ্চল, সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু ভালো কিছু করার আগেই লুটের শিকার হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক খাতে বিনিয়োগ করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বিআইএফএফএলের সাবেক প্রধান নির্বাহী।

দুদকের তথ্য বলছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিআইএফএফএলের পরিচালনা পর্ষদেরও অনুমোদন নেননি তিনি। মানা হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রও। অর্থ জমা রাখা হয়েছে নিম্নমানের বেসরকারি ব্যাংক এবং অ-তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে, যার মধ্যে রয়েছে দুটি বেসরকারি ব্যাংক এবং ১২টি অ-তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

বিআইএফএফএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে এস এম ফরমানুল ইসলাম নিয়োগ পান ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল। পরিচালনা পর্ষদের ২৩তম সভায় তাকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। ২০১৮ সালের ৩১ মে মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাকে ২০১৮ সালের ১ জুন থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ দেয়া হয়। তবে তিনি ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই পরিচালনা পর্ষদের সভা চলাকালে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে অব্যাহতি চেয়ে ইস্তফাপত্র পেশ করেন। বিআইএফএফএল কর্তৃপক্ষ তার ইস্তফাপত্রও গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট তাকে কারণ দর্শানো নোটিস প্রদান করে।

ফরমানুল ইসলাম বিআইএফএফএলের সিইও বা ইডি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে ২০১৫ সালের ৭ জুন পর্যন্ত এফডিআর খাতে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল সরকারি ব্যাংকে ১ হাজার ৪২৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, যার আনুপাতিক হার ৭২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকে ৫৪৬ কোটি ৪১ লাখ ৯২ হাজার টাকা, যার আনুপাতিক হার ২৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তিনি বিআইএফএফএলে যোগদানের পর ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৪২ কোটি ২২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, যার আনুপাতিক হার ৫২ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) এফডিআর ইনভেস্টমেন্টের পরিমাণ ছিল ৩৯৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা, যার আনুপাতিক হার ৪৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি ব্যাংকে এবং এনবিএফআইয়ে মোট এফডিআরের পরিমাণ ছিল ৮৩৮ কোটি ৭৯ লাখ ৭২ হাজার ১৭৮ টাকা।

ফরমানুল ইসলাম পরিচালনা পর্ষদকে অগ্রাহ্য করে নিজের ইচ্ছেমতো বেসরকারি ব্যাংকে ৫২ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত এনবিএফআইয়ে ৪৭ দশমিক ২৮ শতাংশ অর্থ এফডিআর হিসাবে আমানত রাখেন, যা ছিল বিধির লঙ্ঘন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী, এফডিআর হিসাবে বিনিয়োগ করা যাবে সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ এবং পরিপত্রের তালিকা মোতাবেক ১৪টি এনবিএফআইয়ে ৫০ শতাংশ। কিন্তু অভিযোগ, এস এম ফরমানুল ইসলাম তা না করে নিজের ইচ্ছেমতো বেসরকারি ব্যাংকে ৩৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত এনবিএফআইয়ে ৬২ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্থ এফডিআর হিসাবে আমানত রাখেন।

বিষয়টি নিয়ে বিআইএফএফএলের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, মামলা দায়ের যেহেতু একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বিষয়, এ বিষয়ে মন্তব্য করার কিছু নেই। টাকা উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা উদ্ধারের জন্য কাজ চলছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখা হয়েছিল তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু টাকা উদ্ধারও হয়েছে। বাকি টাকা উদ্ধারের তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সরকারি অর্থ উদ্ধারে আমাদের পক্ষ থেকে যা করা সম্ভব তার সবই করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *