ব্যতিক্রমী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপি!

আনোয়ার হোসেন / লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর :

পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপি (সেন্টার ফর দ্যা রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্যা প্যারালাইজড) একটি ব্যতিক্রমী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। মানবসেবার মহান ব্রত নিয়ে মিস ভেলরি টেইলর প্রতিষ্ঠা করেন সিআরপি। ঢাকার অদূরে সাভারে ১৪ একর জমির উপর গড়ে তোলেন এর প্রধান কার্যালয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারা বাংলাদেশে সিআরপি’র মোট ১২টি সেন্টার রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী আমাদের দেশে শতকরা দশ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো প্রতিবন্ধিতার শিকার। সড়ক দুর্ঘটনা, গাছ থেকে পড়ে যাওয়া, জন্মগত ত্রুটি, শিল্প কারখানার দুর্ঘটনা, স্পাইনাল কর্ডের আঘাত প্রভৃতি কারণে প্রতিদিনই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হচ্ছে অনেক মানুষ। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে এই পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে তাদের সারা জীবন কাটাতে হয়। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে পঙ্গুত্বের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সিআরপি এ ধরনের মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করে থাকে।

রিসার্চ, মেইন্টেইনিং এন্ড এভালুয়েশন অফিসার মাহমুদুল হাসান আল জামান জানান, সিআরপি আউটডোর ও ইনডোর এ দুই ধরণের সেবা দিয়ে থাকে। শুক্রবার ব্যতীত যে কোনোদিন মাত্র ৫০ টাকার বিনিময়ে আউটডোর বিভাগে রোগী দেখানো যায়। আউটডোরে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জন নতুন ও ৩০০ জনের মত পুরাতন রোগী আসে। স্ট্রোক, প্যারালাইসিস, বাত ব্যথা জনিত, স্পোর্টস ইঞ্জুরিতে আক্রান্তরা সাধারণত চিকিৎসা নিতে আসে আউটডোরে। যেহেতু এক সেশনে এ ধরণের রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না তাই পরবর্তী সেশনগুলোর জন্য পুরাতন রোগীরা এসে থাকেন।

মোঃ জালাল হোসেন তার ছেলেকে মাসে একবার থেরাপি দিতে নিয়ে আসেন। ফিজিওথেরাপির ক্ষেত্রে ৪০০ টাকা, ২০০ টাকা এবং ১০০ টাকা নেয়া হয়। এখানে যার যার মাসিক আয় গ্রেড অনুযায়ী চার্জ নেয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে গ্রেড এ-তে মাসিক যিনি ১০ হাজার টাকার বেশি আয় করেন সে ৪০০ টাকা এবং বি গ্রেডের যিনি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন সে ১০০ টাকা এবং এর নিচের রোগীর ক্ষেত্রে কোনো চার্জ নেয়া হয় না। মাসিক আয় যাচাই করেই সকল ধরণের চিকিৎসাখরচ নির্ধারণ করা হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে তা বিনামূল্য।

ইনডোরে ১০০ জনের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশু ও প্রতিবন্ধী এবং মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্তদের চিকিৎসা করা হয় এখানে। মেডিকেল উইং, ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ এন্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিএই চার বিভাগে চিকিৎসা করা হয়।

এটি রিহ্যাব সেন্টার হওয়ায় ডাক্তারের চেয়ে থেরাপিস্টদের প্রাধান্য বেশি। এখানে ডাক্তার রয়েছে ১০ জন আর থেরাপিস্ট প্রায় ১০০ জন।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীকে তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে স্বনির্ভর করে তুলতে অকুপেশনাল থেরাপির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে কেবল সিআরপিই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অকুপেশনাল থেরাপি সুবিধা প্রদান করে যাচ্ছে। যাদের কথা বলতে সমস্যা হয় তাদের জন্য বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতির নাম হচ্ছে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি। বাংলাদেশে সিআরপিই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই থেরাপির ওপর স্নাতক ডিগ্রি প্রদান ও থেরাপি সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

সেরিব্রাল পলসি, কগনিশন ও অটিজমসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার শিশুদের চিকিৎসাসেবার জন্য এখানে রয়েছে শিশু বিভাগ। এ বিভাগের ইনচার্জ হোসনেআরা পারভীন জানান, এখানে শিশুদের ইনপেশেন্ট এবং আউটপেশেন্ট দু’ভাবেই সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। শিশুদের থেরাপি সেবা প্রদানের পাশাপাশি তাদের মায়েদের প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দেয়া হয় যাতে তারা বাড়ি ফিরে তাদের শিশুদের এই সেবা অব্যাহত রাখতে পারে।

শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার শিশুদের দেহভঙ্গি সঠিক রাখা, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা ও সহজে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারার লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় স্পেশাল সিটিং চেয়ার বিভাগ। এই বিভাগের মাধ্যমেই বিশেষ বিশেষ প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি এই স্পেশাল সিটিং-এ লোহার এবং কাঠের তৈরি বিভিন্ন ধরনের চেয়ার তৈরি করা হয়ে থাকে। এই হাসপাতালে কোনো পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী আসলে রোগীর উপযোগী করে চেয়ার তৈরি করে দেয়া হয়।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য বিশেষ চেয়ার , সার্ভাইক্যাল পিলো, লাম্বাররোলসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়ক সামগ্রী তৈরি করা হয়। যাদের হাত, পা, আঙ্গুল নেই তাদের জন্য এখানে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করে দেয়া হয় এবং সংযোজন করে থাকে প্রস্থেটিক্স ও অর্থোটিক্স বিভাগ।

সিআরপি পুনর্বাসন সেবার অংশ হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করে থাকে। এ লক্ষ্যেই সিআরপির সাভার ও গণকবাড়ি কেন্দ্রে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। যেখানে বিনামূল্যে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তিদের নিজ নিজ শিক্ষা, দক্ষতা ও আগ্রহ অনুযায়ী সেলাই, ইলেকট্রনিক্স মেরামত, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, দোকান ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারেও সহায়তা করে থাকে। ডোনার পাওয়া গেলে প্রশিক্ষন শেষে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়।

সিআরপি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করে একীভূত স্কুল উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি টেইলর স্কুল। জন্মগত বা অন্যান্য কারণে প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়ে সমাজ থেকে ছিটকে পড়া শিশুদের শিক্ষা ও সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা এ স্কুলের লক্ষ্য।

প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবী এসে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের বিনামূল্যে সেবা দিয়ে থাকেন। গুলশান হামলার আগে প্রতি মাসে এ সংখ্যা ছিল ২০-২৫ জন। বর্তমানে ৭ জন আছেন। যুক্তরাজ্য থেকে আগত জর্জিনা’র সাথে কথা হয়। তিনি ওখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওথেরাপি নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। এক বছর হল সিআরপিতে আছেন, চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বেশির ভাগ বিদেশী তবে কিছু দেশি সেচ্ছাসেবীও কাজ করে। স্বেচ্ছাসেবীদের সবাই বিশেষজ্ঞ নয়। যে যার সামর্থ্য মতো সেবা দিয়ে থাকেন। সারা বাংলাদেশে সবক’টি সেন্টার মিলে মোট স্টাফ ৯০৩ জন।

ক্রমান্বয়ে সিআরপি’র কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে ঢাকার মিরপুর,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *