শিশুর সাঁতার শেখা এবং ঝুঁকিমুক্ত জীবন গড়ে তুলতে মা-বাবাকেই আগে সচেতন হতে হবে

মোস্তাকিম স্বাধীন / লিগ্যাল ভয়েস টোয়েন্টিফোর :

একসময় বলা হতো নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু নগর সভ্যতায় মানুষ এখন নদীর এবং
জলাশয়ের কাছে বসবাস সংকুচিত করে ফেলেছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এখন সবুজ প্রকৃতি বন উজাড় করে নদী ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি করেছে নিজেদের আবাসস্থল। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না নদী আমাদের জীবন, যেখানে শৈশবের সাঁতার কাটার অনেক স্মৃতি আমাদের সঙ্গে জড়িত। নদীকেন্দ্রিক বহু অঞ্চলের মানুষের পরিবার এখনো নদীকে ঘিরেই চলছে। কিন্তু শহরমুখী মানুষের প্রবণতার কারণে নদী বা জলাশয়ে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। যে দুর্ঘটনার শিকার অধিকাংশই শিশু,
যারা সাঁতার জানে না।

শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শৈশবে সাঁতার শেখাটি মা-বাবা একসময় গুরুত্ব দিয়ে না ভাবলেও এখন সময় এসেছে মা-বাবাকে প্রতিটি পরিবারেই শিশুদের সাঁতার শেখা এখন জরুরি এবং ঝুঁকিমুক্ত জীবন তৈরি করতে পারে বাংলাদেশে প্রতিবছর বন্যায় দেশের এক তৃতীয়াংশ প্রায়ই পানিতে ডুবে যায়। এলাকা ভেদে এসব জায়গায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবরই আমরা বেশি জানতে পারি। এসব মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেখা যায় অধিকাংশই শিশুর নিথর শরীর আমাদের পরিবারকে নাড়া দেয়।

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে ইমামুল হক নামের এক ব্যক্তি জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এবং বাংলাদেশের শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু দেখে নিজেই তাঁর বাসার সামনে শুরু করেছিলেন শিশুদের সাঁতার শেখানোর কাজটি। একসময় চাকরি করলেও বর্তমানে তিনি অবসর সময় কাটান। তিনি ৫০ থেকে ১০০ ফুট বর্গাকৃতির পুকরটি বানিয়ে ফেলেন বিশাল সুইমিংপুল।

প্রথমদিকে গ্রামের বহু শিশু-কিশোররা তাঁর সেই পুকুরে সাঁতার শেখা শুরু করে। সময় বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু শিশু-কিশোররা লেখাপড়া এবং চাকরির কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়। ক্রমেই সেই পুকুরপাড়ে শিশুদের প্রাণবন্ত ঝাঁপ দিয়ে গোসল করা এবং সাঁতার শেখার প্রবণতা কমতে শুরু করেছে। ইমামুল ইসলাম জানান, আজ থেকে ৭-৮ বছর আগে যখন আমি সাঁতার শেখানো শুরু করেছিলাম, তখন কোনো পারিশ্রমিক নিতাম
না। এখনো কাজটি করে যাচ্ছি স্বেচ্ছায়। তিনি বলেন, এজন্য পাড়া-মহল্লার যুবকদের এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সাঁতার শুধু শিশুদের জীবন রক্ষা করতে পারে না। এটি এক ধরনের শারীরিক কসরত এবং ব্যায়াম। সরকারের উচিত স্বাস্থ্য সচেতনতায় শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখানোর ক্ষেত্রে উদ্যোগী হওয়া।

এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি ৩০ মিনিটে একটি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। প্রতিবছর এক থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় ১৬ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এ সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে।

ঈশ্বরদী উপজেলার ইমামুল যিনি সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায় তাঁর উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় ছড়িয়ে দিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন স্থানীয় সংবাদকর্মী মাহবুবুল হক দুদু।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পানিতে ডুবে মারা যায় বাংলাদেশে। এমনকি রোগে-শোকে ভুগে নয়, কেবল পানিতে ডুবেই শিশুর মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায়ই বেশি পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু ঘটছে। ইতোমধ্যে বুলুমবার্গ ফ্রিলানথ্রপিস, জন হপকিনস ইন্টারন্যাশনাল ইনজুরি রিসার্চ ইউনিট এবং দ্য সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বা সিআইপিআরবি এবং আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ড. আমিনুর রহমান বিবিসি বাংলায় এক
সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ’প্রতিবেশী দেশ ভারতে পানিতে মৃত্যুর হার বাংলাদেশের চেয়ে
বেশি হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার বেশি।

তিনি বলেছেন, শিশুদের এমন মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মা-বাবাদের কাজে ব্যস্ত থাকা।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণাঞ্চলের
বরিশালে প্রতিবছর যে পরিমাণ পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে ২৪টি উপজেলায় ৬৭ শতাংশ শিশুর মৃত্যুই ঘটে পানিতে ডুবে সাঁতার না জানার কারণে। শিশুদের এই মৃত্যুর বিষয়টি আমরা গণমাধ্যমে সেইভাবে প্রচার হতে দেখি না এমন কথা বললেন অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা অধিকাংশ দুর্ঘটনার সংবাদ হিসেবে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার খবর শুনি কিন্তু সাঁতার না জানায় শিশুরা যে ঝুঁকির মধ্যে আছে এবং তারা যখন পানিতে ডুবে মারা যায়, তখন আমরা কখনো বলি না শিশুটি সাঁতার না জানায় মারা গেছে।

ঈশ্বরদী সরকারি এয়ারপোর্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাজেদুল ইসলাম সাজু বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে কিংবা মা-বাবাকে শিশুর ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলোর নিরাপত্তা রক্ষার কথা বা লাইফ স্কিলের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু শিশুর সাঁতার শেখার বিষয়টি আমরা পরিবারের মা-বাবার ওপরই গুরত্ব দিয়ে থাকি। তাঁরা সচেতন না হলে শিশুর ঝুঁকির দিকগুলো থেকেই যাবে।শেখার প্রয়োজনটি শুধু শুধু শিশুদের জন্যই নয়, নদী এলাকা বা যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষেরই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জেনে রাখা উচিত, বলছিলেন পাবনার ক্রীড়াবিশ্লেষক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের এখন উচিত কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা তৈরি। শিশুদের সঠিক বয়সের শুরু থেকেই তত্ত্বাবধান করা। ইতোমধ্যে সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন স্থােেন ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করেছে এবং ইউনিসেফের সহায়তায় শিশুর সুরক্ষায় নানামুখী কার্যক্রম চালু করেছে।

একইভাবে সিআইপিআইবির উদ্যোক্তারা জানান, গবেষণায় দেখা গেছে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ৬৬ শতাংশই ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে। এ সময়টায় গ্রামীণ নারীরা গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত থাকে। সিআরপিআইবি এই ঝুঁকি রোধ করতে তিন হাজারের বেশি সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

অন্যদিকে রাজধানী ঢাকায় অধিকাংশ পরিবারের মা-বাবা শিশুদের বিভিন্ন চারতারকা হোটেল, রিসোর্ট বা জাতীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্স মোটা অঙ্কের বিনিময়ে সাঁতার শেখার প্রতি আগ্রহী হয়েছে। এ বিষয়টি জানালেন রাজধানীর অভিজাত বারিধারা এলাকায় বসবাসরত একজন অভিভাবক ইসরাত জাহান সোমা। শিশুদের মধ্যে যে কেউ যদি পানিতে ডুবে ১ মিনিটি ভেসে থাকতে পারে, তাহলে সেই শিশুটি অনেকটায় আশঙ্কামুক্ত। শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। শিশুর যতœ এবং নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার পাশাপাশি শিশুর মা-বাবার সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *