ভ্যাকসিন নিয়ে যে ছয়টি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি

 

স্টাফ রিপোর্টার

সাম্প্রতিক সময়ে ভ্যাকসিন ট্রায়ালে ইতিবাচক ফলের খবরগুলো খুবই রোমাঞ্চকর। একটি ভালো ভ্যাকসিন হতে পারে মহামারী শেষের উপায়।

গত সপ্তাহে ফাইজারের ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফল বলছে, তাদের ভ্যাকসিন কভিড-১৯-এর সংক্রমণ রোধে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকারিতা দেখাতে পারে। পরে চূড়ান্ত ফলে তারা সেটিকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর বলে উল্লেখ করেছে। এর মাঝে আরো ভালো ফলের কথা বলেছে মডার্নাও। তাদের অন্তর্বর্তীকালীন ফলে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতার ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। যেখানে ভ্যাকসিন দ্বারা গুরুতর অসুস্থতা রোধ করার কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি সেখানে কোনো সুরক্ষাজনিত গুরুতর কোনো উদ্বেগের কথা বলা হয়নি। এ ভ্যাকসিন কয়েক হাজার অংশগ্রহণকারীর মাঝে প্রয়োগ করা হয়েছে।

আরো বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন এখন বিকাশের পর্যায়ে আছে, সামনের দিনগুলোতে আরো বেশকিছু ফল পাওয়া যাবে। তাদের শিরোনামও হয়তো এগুলোর মতো আকর্ষণীয় হবে। কিন্তু জরুরি হচ্ছে আরো গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখা যে এ ফলগুলো আসলে কী অর্থ বহন করে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই এখানে নতুন ভ্যাকসিন নিয়ে ছয়টি প্রশ্ন তোলা হলো।

১. ভ্যাকসিন কি তাহলে নিরাপদ?

যদি হাজারো অংশগ্রহণকারীর তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালটি সফলতা লাভ করে, তবে উত্তর হ্যাঁ হবে। যদি বড় কোনো ধরনের সন্দেহ থাকত, তবে ভ্যাকসিনটি এতদূর আসতে পারত না।

ঐতিহাসিকভাবে ওষুধ কোম্পানিগুলো নেতিবাচক ফল গোপন করতে সক্ষম। কিন্তু এখন এটা আইনগতভাবে জরুরি যে সব ট্রায়ালের ফল প্রকাশ করতে হবে এবং অন্য বিজ্ঞানীরা তা পর্যালোচনা করে দেখবেন। এর ফলাফলস্বরূপ এ খাতটি যতটা বিশ্বাসযোগ্য ছিল, তারচেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার পরও আমাদের এখনো অন্তর্বর্তীকালীন ফলের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।

নজিরবিহীন গতিতে উৎপাদিত হওয়ার কারণে কিছু মানুষ কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন নিয়ে উদ্বিগ্ন। যদিও বেশির ভাগ ভ্যাকসিনেরই ভিত্তি হচ্ছে দারুণ সুরক্ষা প্রোফাইলসহ টেকনোলজি প্লাটফর্ম। এখানে অল্প নতুন প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে, কিন্তু ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং রেগুলেটরি প্রক্রিয়া বেশ কঠোর। তবে এটা জানা এখনো কঠিন যে এর দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো কী হবে। যদিও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এটা বেশ দুর্লভ।

২. এসব পরিসংখ্যান কি ট্রায়ালগুলোর উদ্দেশ্যকে প্রতিফলিত করে?

ট্রায়াল সাধারণত অনেক কিছুই পরিমাপ করে। তবে সাধারণত একটি প্রাথমিক কেন্দ্রীয় প্রশ্ন বা বিষয় থাকে, যার উত্তরের জন্য ট্রায়ালটি ডিজাইন করা হয়েছে। ট্রায়ালের কিছু গৌণ প্রশ্ন থাকে কিন্তু এগুলোর উত্তর দেয়াই সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। যদি আপনি উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন ধরনের টেস্ট চালান, তবে তা কিছু গৌণ প্রশ্নের উত্তর দেবে। ট্রায়াল ডাটাকে এ উপায়ে ভুল বোঝাকে বলা হয় পি-হ্যাকিং বলে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল রেজিস্ট্রি পরীক্ষা করে আপনি যেকোনো ধরনের প্রাথমিক এবং গৌণ বিষয়গুলো অনুসন্ধান করতে পারবেন। আবারো এগুলো অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল কিনা তা বিবেচনা করা জরুরি। যদিও এমন ফল প্রতিশ্রুতিশীল হতে পারে, যেমনটা ফাইজার ও মডার্না দেখিয়েছে। ফাইজার অবশ্য চূড়ান্ত ফলেই উচ্চ কার্যকারিতার কথা বলেছে।

৩. ট্রায়াল কি সঠিক পরিমাপ করতে পারে?

ওষুধের ‘কাজ করা’ কোন বিবেচনায় গণ্য হবে তা অনেক রোগের জন্য নির্ধারণ করা কঠিন। কিন্তু ভ্যাকসিনের জন্য, এ প্রশ্নটির উত্তর বেশ সরল। যারা ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছে, তারা অসুস্থ হচ্ছেন কিনা? যেকোনো জটিল ব্যবস্থা অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

৪. কাদের ওপর ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হয়েছিল?

ট্রায়ালের যে ফল তা কি বাস্তব পৃথিবীতে একই থাকবে? এখানে জনসংখ্যার মাঝে পার্থক্যটি বুঝতে পারা গুরুত্বপূর্ণ (এই ক্ষেত্রে সবাই যারা কভিড-১৯ দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে) এবং সেই জনসংখ্যার নমুনায় যারা অংশ নিয়েছিল।

অনেক কেসে ট্রায়ালগুলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সতর্কতার সঙ্গে মিলে যায় (এবং তুলনা করা যায়) এমন নমুনা ব্যবহার করেন। এখানে একটিতে ভ্যাকসিন এবং অন্যটিতে প্লসেবো দেয়া হয় (যেমন স্যালাইন ইনজেকশন কিংবা এরই মধ্যে অন্য রোগের জন্য বিকশিত ভ্যাকসিন)। এটা করা হয়, কারণ অংশগ্রহণকারীদের মাঝে ভ্যাকসিনেটেড হওয়ার যে চিন্তা তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, যার এক ধরনের প্রভাব রয়েছে।

প্রথম ধাপের ট্রায়ালে সুরক্ষা উদ্বেগের অর্থ হচ্ছে নমুনাগুলো কিছু স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দুশ্চিন্তাসহ কিছু তরুণ এবং সবল মানুষের সমন্বয়ে তৈরি হয়, যা কিনা সামগ্রিক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে ট্রায়াল সামনের দিকে এবং পরের ধাপে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে গবেষকরা জনগণের আরো অন্যান্য প্রতিনিধিকেও এখানে যুক্ত করে।

এ কারণে শেষ পর্যায়ের (তৃতীয় ধাপ) ট্রায়াল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ভ্যাকসিন যাদের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার তাদের প্রতিনিধি হিসেবে এখানে যুক্ত করা হয়। ট্রায়ালের ফলাফলের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ সাধারণত কাদের নমুনা নেয়া হয়েছে তা বর্ণনা করে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে কার্যকারিতার হার (এ ভাগটি করা হয় লিঙ্গ, বয়সসহ আরো নানা বিবেচনায়)। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতার যে শিরোনাম, সেটি শেষ পর্যন্ত জনসংখ্যার সবার মাঝে একইরকম থাকবে না।

কভিড-১৯-এর জন্য যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, আমরা জানি যে বয়স্করা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। তাই বয়স্কদের মাঝে কার্যকারিতা দেখানোর আগে কোনো ভ্যাকসিনকে চূড়ান্ত ধরে নেয়া ভুল। তবে এখানে সুখবর হচ্ছে, ফাইজারের তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের চূড়ান্ত ফল বলছে, তাদের ভ্যাকসিন ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ওপর ৯৪ শতাংশ কার্যকর, যা করোনা নির্মূলে বড় একটি পদক্ষেপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *